নির্বাণ, না কি নিহিলিজম: শূন্যতার বুকে দাঁড়িয়ে দর্শনের দ্বৈত আত্মদর্শন
নির্বাণ ও চার্বাক দর্শন: একই গন্তব্যের ভিন্ন পথ?
কিউ.বি সুজন
ভারতের দার্শনিক ইতিহাসে চার্বাক ও গৌতম বুদ্ধের নির্বাণবাদকে সাধারণত বিপরীত দুই মেরু বলা হয়, একদিকে কড়া ভৌতিকতা, অন্যদিকে কথিত আধ্যাত্মিক মুক্তি। কিন্তু শেষ গন্তব্য যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, ব্যাধি নেই, মৃত্যু নেই এই ঘোষণাটি সামনে এনে যদি দুদর্শনের ফল তুলনা করা হয়, দেখা যায় আশ্চর্য এক সাদৃশ্য। চার্বাকের সোজাসাপ্টা সব শেষ এবং বৌদ্ধ নির্বাণের সব নিবে গেছে দুটিই সংসারধর্মী অস্তিত্বের অবসান নির্দেশ করে। পার্থক্য যেন কেবল শব্দের পোশাক। চার্বাক বলেন খোলাখুলি, বুদ্ধ বলেন কৌশলে। এই লেখায় আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্বাণ পূর্ব নৈতিক বা কারণ কার্য, পুনর্জন্ম, কর্মফল ইত্যাদি আলোচনায় যাচ্ছি না। কেবল চূড়ান্ত অবস্থাটিকেই বিচার করছি, ঘটনার শেষ ছবি কী। ঠিক এই শেষ ছবিটিই দর্শনকে সবচেয়ে নির্মমভাবে খোলাসা করে দেয়, কারণ সেখানে শব্দের জটিলতা ফুরোয়, থাকে কেবল ফল।
চার্বাকের বক্তব্যটি অত্যন্ত স্বচ্ছ। আত্মা বলে কোন স্বতন্ত্র সত্তা নেই; দেহই চেতনাকে বহন করে; দেহ যন্ত্র থেমে গেলে আলো নিভে যাওয়ার মতো চেতনা নিভে যায় এবং এখানেই সমাপ্তি। কোনো পুনর্জন্ম নয়, কোনো পরলোক নয়, কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যাও নয়। এই ভঙ্গি দার্শনিক সাহসের। এখানে আবেগ নেই, অলঙ্কার নেই, দায়বদ্ধ যুক্তির বাইরে যাবার লুকোনো দরজা নেই। ভৌতিকতার এই বর্ণনায় অস্তিত্বের শেষ মানে সত্যিই শেষ। চূড়ান্ত নীরবতা, যাচাই পরীক্ষার দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতাশূন্য এক অবসান। এই অবস্থাকে যে ই নাম দেওয়া হোক, এর কার্যকর অর্থ দাঁড়ায় ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার সব ধারাই ছিন্ন।
এবার দেখা যাক নির্বাণের বয়ান কী দিকে ইঙ্গিত করে। বৌদ্ধ সাহিত্যে নির্বাণকে বলা হয় এমন এক পরিসর যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, অর্থাৎ যে প্রবাহ ছিল তা সেখানেই থেমে যায়। শব্দের পক্ষে নির্বাণ মানে নিভে যাওয়া। কিন্তু বর্ণনার সময় বলা হয়, একে অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কোনো দাবিতেই শামিল করা যায় না; এটিকে বলা হয় অজাত, অমৃত, অসংখত। এখানেই তর্কের সূক্ষ্ম কেন্দ্র। যদি আপনি বলেন এটি না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব, তবে আপনি প্রথাগত যুক্তিতত্ত্বের বাইরে এক তৃতীয় বর্গ হাজির করছেন, যা বাস্তবিক বৈশিষ্ট্য দেখাতে না পারলে ভাষামাত্রে পরিণত হয়। আর যদি বলেন, নির্বাণ অবস্থা, তাতে প্রবেশ করলে জন্ম জরা মৃত্যু শূন্য, তবে ফলের দিক থেকে এটি চার্বাকের ঘোষিত শূন্যতার সমান। দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা চূড়ান্তভাবে লোপ পায়। এখানে অবস্থা শব্দটি শেষ পর্যন্ত কেবল নামটুকুই যোগ করে, ফল পাল্টায় না।
এ তর্ককে শক্ত করতে কয়েকটি রূপক ও চিন্তা পরীক্ষা টেনে আনি। প্রথম রূপক দুটি দরজা। দরজা ক শূন্যতা, দরজা খ অশর্তাধীন ধাতু। দু দরজা পেরিয়ে যে মাঠে পৌঁছানো যায় সেখানে জন্ম ঘটে না, জরা নেই, মৃত্যু নেই; অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই। এখন জিজ্ঞেস করুন, মাঠে দাঁড়িয়ে আপনি কি বলতে পারবেন কোন দরজা দিয়ে ঢুকেছিলেন। যদি না পারেন, তবে দু দরজার নামফলক ভিন্ন হলেও গন্তব্য এক। দ্বিতীয় রূপক দুটি প্রদীপ। এক প্রদীপ নিভে গেছে বাতাসে, অন্যটি ঢাকনা দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রদীপের আলো, অর্থাৎ অভিজ্ঞতার প্রবাহ, দুটিতেই শেষ। বাতাসে নিভেছে বনাম ঢাকনা দিয়ে নিভেছে এ পার্থক্য ঘটনাপূর্ব কারণবর্ণনায়; কিন্তু নিভে যাওয়া এই ফলের জায়গায় তুল্য। নির্বাণের ক্ষেত্রে অশর্তাধীন নামের ঢাকনা, চার্বাকের ক্ষেত্রে প্রকৃতিস্থিতির বাতাস; আলো দুটিতেই নিভে যায়। তৃতীয় রূপক নদী ও জলাশয়। নদীর স্রোত থেমে জলাশয়ে ঢুকে গেলে জলের নতুন গতির কথা বলা যায় না; নদী পরিচয়ের দিক থেকে সেটি সমাপ্ত। নির্বাণে স্রোত থামে বলেই তো বলা হচ্ছে জন্ম নেই; সুতরাং থামা র এই বর্ণনা নিজেই এক সমাপ্তি ঘোষণা, যা চার্বাকের শেষ এর সঙ্গে ফলগতভাবে সমার্থক।
এখন গণ্যতত্ত্বের একটি প্রশ্ন তোলা যাক, স্থিতির মানদণ্ড। যদি কোনো অবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচয়, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, অনুভব, এই সব কিছুর ধারাবাহিকতা একেবারে অনুপস্থিত হয়, তবে কার্যকর অর্থে আমি বলে যে সত্তা, তার অস্তিত্ব দাবির মানে থাকে কী। নির্বাণ পরবর্তী অবস্থাকে যদি বলা হয় চিরশান্ত, অবর্ণনীয়, অজাত, এসব শব্দের নান্দনিকতা সত্ত্বেও সেই অবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনও ধারাবাহিকতা না থাকলে সেটিকে অভিজ্ঞতার টেবিলে রাখার উপায় নেই। ঠিক এই জায়গায় চার্বাকের ভাষা বেশি সৎ, সে কোনো তৃতীয় অর্থের অবস্থান দাঁড় করায় না, বলে, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শূন্য, সেখানেই দাবিও শূন্য। বৌদ্ধ বয়ান এখানে কাব্যময়তাকে আশ্রয় করে, কিন্তু কাব্য যুক্তির জায়গায় প্রমাণ নয়। এ কথা স্বীকার করলেই তর্কপরীক্ষার মেকানিজমে চার্বাকের স্বচ্ছতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বৌদ্ধ আপত্তিকারী সাধারণত বলেন, নির্বাণ বিনাশ নয়, নিরোধ, এটি দুঃখের কারণের নিবৃত্তি, অস্তিত্বহীনতা নয়। কিন্তু নিরোধের ফল যদি হয় যে কোন জন্ম আর ঘটছে না, কোন জরা নেই, কোন মৃত্যু নেই, তাহলে অভিজ্ঞতার দিক থেকে তা বিনাশবাদের চূড়ান্ত অবস্থারই সমার্থক। নিরোধ নামটি শ্রুতি মধুর, কিন্তু নিরোধ এর কার্যকর ফল যদি অভিজ্ঞতা শূন্য হয়, তবে বিনাশ এর সাথে কী করে তা ভিন্ন। নামপল্টানো মাত্র। আরেকটি আপত্তি, নির্বাণ অস্তিত্ব অনস্তিত্বের বাইরের একটি বাস্তবতা। এখানে বাইরে শব্দটি অজ্ঞেয়বাদী ছায়া টেনে আনে; পরীক্ষা অযোগ্য যে দাবিকে আপনি বাইরে বলে রক্ষা করবেন, তা দর্শনের আদালতে টিকতে চাইলে অন্তত একটিমাত্র পরীক্ষণ মানদণ্ড দেখাতে হবে। না হলে এটি ভাষার মায়া। পরীক্ষা অযোগ্য দাবির সঙ্গে সমতুল্য ফল বিবরণ ধরে চার্বাককে খণ্ডন করা যায় না, বরং চার্বাকের কম অনুমানের তত্ত্বই তখন অর্থগত অর্থনীতার নিয়মে প্রাধান্য পায়।
এখানে ওকামের ক্ষুরের কথা স্মরণযোগ্য। দুটি তত্ত্ব যদি একই ফল দেয়, তবে কম অনুমান জড়িত তত্ত্বটিই যুক্তিসঙ্গত। চার্বাকের অনুমান অল্প। দেহ নিভলেই আলো নিভে যায়, ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার শেষ। নির্বাণ বর্ণনায় একটি অতিরিক্ত সংযোজন আছে, অশর্তাধীন নামের এক ধাতু, যা না অস্তিত্ব না অনস্তিত্ব, তবু ফলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অবসানই ঘটায়। এই অতিরিক্ত সংযোজন ফল পাল্টায় না, কাজেই দার্শনিক অর্থনীতিতে এটি অতিরিক্ত ব্যাগেজ। বুদ্ধের ভাষায় এটি কাব্যিক মহিমা, তবে তর্কে এটি উপপাদ্য নয়। বৌদ্ধ পক্ষে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ, এ অশর্তাধীনকে শুধু নাম নয়, ফলগত পার্থক্য হিসেবে দেখানো। যতক্ষণ সেটা না হয়, ততক্ষণ চার্বাকীয় ফল সমতা টিকে থাকবে।
আরও একটি চিন্তা পরীক্ষা। একটি মঞ্চনাটক কল্পনা করুন। চরিত্র ক মৃত্যুবেলায় পর্দার আড়ালে হারিয়ে যায়; চরিত্র খ নির্বাণে পৌঁছে আলোর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যায়। দর্শকগণ কেবল পর্দার পরের নীরবতা দেখেন। কেউ ফিরে আসে না, কেউ কথা বলে না, কোনো নতুন দৃশ্য শুরু হয় না। দর্শকের অভিজ্ঞতায় দুই প্রস্থান অভিন্ন। নাট্য সমালোচক এরপর লিখলেন, ক এর প্রস্থান শেষ, খ এর প্রস্থান অজাত এ প্রবেশ। এই দুই ভাষা নাট্য বাস্তবতায় আলাদা ফল দেখাতে পারল কি। না। সুতরাং ভাষার অলঙ্কার ও অভিজ্ঞতার ফল, এই দুইকে আলাদা করে দেখা মাত্রেই বোঝা যায়, নির্বাণ ও চার্বাক শেষ দৃশ্যে এসে একই মঞ্চ ভাগ করে নেয়।
এ পর্যায়ে কেউ বলতে পারেন, নির্বাণ নৈতিক সাধনার ফল; চার্বাক নৈতিকতার প্রতি উদাসীন। কিন্তু আমরা নীতিশাস্ত্রের আলাপ তুলছি না; আমরা শুধু শেষ অবস্থার তুলনা করছি। নৈতিক অনুপ্রেরণা সত্য মিথ্যার প্রমাণ নয়; অনেক মিথ্যাও নৈতিক অনুপ্রেরণা জোগায়, অনেক সত্যও কঠিন ও নিরাবেগ। কাজেই নৈতিকতা দিয়ে চার্বাককে খণ্ডন বা নির্বাণকে প্রমাণ করা যাবে না। সত্যের আদালতে দাঁড়াবে কেবল ফল বর্ণনা। আর সেই ফল বর্ণনায় দুই পক্ষ সমার্থক, একদিকে সব শেষ, অন্যদিকে সব নিবে গেছে।
এখানে ভাষাতত্ত্বের একটি কৌশলগত প্রশ্নও আছে। যদি একটি শব্দ নির্বাণ নিজের সংজ্ঞায়ই বলে আমি বর্ণনার বাইরে, তবে সেই শব্দের প্রস্থাপিত দাবিটি জন্ম জরা মৃত্যু নেই কীভাবে ভাষিক সত্য শর্ত অর্জন করে। যদি বলেন কারণ সিদ্ধপুরুষেরা জানেন, তবে সেটি কর্তৃত্ব দাবি, প্রমাণ নয়। যদি বলেন ধ্যান অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে, তবে সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা তো আবার ভাষায়ই। আর যদি অভিজ্ঞতা নির্বচন অসম্ভব, তবে দাবি টাই নিরুদ্দেশ। ঠিক এই টানাপোড়েনে বৌদ্ধ নির্বাণ বর্ণনার দার্শনিক দুর্বলতা চোখে পড়ে। শব্দের শৌর্য বেশি, প্রমাণের দিক পাতলা। চার্বাক ঠিক বিপরীত, শব্দ কম, প্রমাণের প্রতিশ্রুতি বেশি।
এ পর্যায়ে একটি সম্ভাব্য পাল্টা প্রশ্ন। ধরা যাক ফল সমতা আছে, তবু নির্বাণকে মূল্যবান বলা যায়, কারণ এতে ভয় আসক্তি নিভে যায়। এর জবাব সহজ। আমরা মূল্য আলোচনা করছি না; আমরা কেবল বলছি, ফল সমতার জায়গায় এসে চার্বাক ও নির্বাণ এক। আপনি নির্বাণকে মূল্যবান বলতে পারেন, কিন্তু সেটি চার্বাকের শেষ এর থেকে ফলগতভাবে ভিন্ন এই দাবি তুলতে পারবেন না। ভিন্নতা দেখাতে হলে পরীক্ষণ যোগ্য একটিমাত্র বৈশিষ্ট্য দেখাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাণ পরবর্তী কোনো চিহ্ন যা চার্বাকের শেষ এ অনুপস্থিত। এমন চিহ্ন যদি নীতিগতভাবেই অস্বীকার করা হয়, নির্বাণ অবচিহ্ন, অচিহ্ন, তবে ফল সমতার দাবি শক্তি পায়।
সমালোচনার ধার আরেকটু বাড়াই। বুদ্ধ নিজে উচ্ছেদবাদীদের সমালোচনা করেছেন, মৃত্যুতে সব শেষ ধারণাকে তিনি ভুল বলেছেন। কিন্তু তাঁর দেয়া শেষ অবস্থার ছবি, জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, এই ছবি যদি অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে চার্বাকের ছবির সাথে অভিন্ন হয়, তবে উচ্ছেদ সমালোচনা কাকে উদ্দেশ করে। এতে কি এমনটা দাঁড়ায় না যে বুদ্ধ একই ফলকে ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে আলাদা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। চার্বাকের বিরুদ্ধে যথাযথ তর্ক হতো, যদি নির্বাণ অবস্থায় কিছু এমন দেখানো যেত যা চার্বাকের শেষ এ নেই। কিন্তু আমরা দেখি, কোনো অভিজ্ঞতাক্রম নেই, কোনো জন্ম নেই, কোনো মৃত্যু নেই। চার্বাকের শেষ এও নেই। দার্শনিক প্রভেদ কোথায়।
শেষে, একটি সারসংক্ষেপ যুক্তি। ক নির্বাণ পরবর্তী অবস্থায় জন্ম জরা মৃত্যু নেই। খ জন্ম জরা মৃত্যু না থাকলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই। গ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা না থাকলে অস্তিত্ব শব্দটি কার্যকরভাবে প্রযোজ্য নয়। ঘ কাজেই নির্বাণ পরবর্তী অবস্থার ফলগত অর্থ দাঁড়ায় অভিজ্ঞতা শূন্য, যা চার্বাকের সব শেষ এর সমার্থক। তর্কের ভাষায়, দু দর্শনের শেষ অবস্থা extensionally equivalent, বাহ্যিক প্রয়োগক্ষেত্রে এক। অন্তঃসারভেদ দেখাতে না পারলে নামভেদ দার্শনিক প্রমাণ নয়।
এই দীর্ঘ আলোচনার সারমর্ম তাই উত্তেজক হলেও সরল। চার্বাক ও নির্বাণ, দুটি পথ, দুই শব্দভাণ্ডার, দুটি ঐতিহাসিক পরিসর। কিন্তু চূড়ান্ত দৃশ্যে এসে পরিণতি একই। কেউ একে বলবেন শেষ, কেউ বলবেন নিরোধ, কেউ বলবেন অজাত অমৃত। দর্শনের চোখে তিনটিই অভিন্ন ফল ঘোষণা।
অতএব শেষ প্রশ্নটি পাঠকের দিকে ছুঁড়ে দিতে চাই-
গৌতম বুদ্ধ যে নির্বাণ পরবর্তী অবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, কোনো অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই, সেটি কি মূলত চার্বাকদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই নতুন অলংকারে পুনঃউপস্থাপন নয়?
ঈশ্বর নেই বলিনি, খুঁজে পাইনি বলেছি...
![]() |
| qbsujon |
শুরুটা একেবারেই সাধারণ ছিল, আমি কেবল জানতে চেয়েছিলাম।
না, কোনো বিদ্রোহের শখ ছিল না, মূর্তি ভাঙার মঞ্চেও উঠিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, কে আছেন? সত্যিই আছেন তো?
বলা হয়, তিনি আছেন। কিন্তু কোথায়?
আমি চারদিকে তাকালাম। গায়ে সাদা জামা, মনের ভেতর কালো প্রশ্ন, আর চোখে পাথরের মতো এক টুকরো বিস্ময়। রাস্তায় হাঁটছি, কানে বাজছে লাউডস্পিকারে প্রার্থনার শব্দ। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। এই যে সবাই এত আত্মবিশ্বাসে বলে, ঈশ্বর আছে, তারা কি দেখা পেয়েছে?
তারা বলে, বিশ্বাস করো।
আমি বলি, বিশ্বাস কেন করব?
তারা বলে, প্রশ্ন কোরো না। এ পাপ।
আমি বলি, প্রশ্নই যদি পাপ হয়, তবে উত্তরগুলো এত অসহায় কেন?
ধর্মের দোকানে ঢুকলাম। সেখানে পুজোর প্যাকেজ, উপবাসের ছাড়, দান করলে এক্সট্রা কৃপা ফ্রি, সবই আছে। শুধু নেই সেই যিনি দোকানের মালিক!
একজন বললেন, তিনি মাটির মধ্যে। আরেকজন বললেন, তিনি আকাশে। কেউ বললেন, জলেই তিনি, আবার কেউ বললেন, চোখে ধরা যায় না, মন দিয়ে দেখতে হয়।
আমি মন দিয়ে দেখতে চাইলাম।
কিন্তু মন তো বিভ্রান্ত! সে তো বিজ্ঞাপনে বিভোর, রঙিন পোশাকে আচ্ছন্ন। সে তো ঈশ্বর খোঁজে না, খোঁজে স্বস্তি, নিরাপত্তা আর লাভ।
আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, ঈশ্বর কি তাহলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান?
জিজ্ঞাসা করতেই কেউ আমার দিকে আগুন ছুঁড়ল। বলল, তুমি নাস্তিক? আমি বললাম, তুমি যে আস্তিক, তার প্রমাণ কী?
সে বলল, আমার বিশ্বাসই প্রমাণ।
আমি বললাম, তাহলে আমার সন্দেহই যুক্তি।
আমি দেখলাম, মানুষ প্রার্থনার নামে নিজেকে আশ্বস্ত করে। বিপদের সময় তাঁকে ডাকে, আর স্বস্তির সময় ভুলে যায়। ঈশ্বর যেন এমারজেন্সি সার্ভিস, ২৪ ঘণ্টা অন, কিন্তু কল রিসিভ হয় কদাচিৎ।
একবার এক ভক্ত বললেন, আমি মন্দিরে গিয়ে দান করেছি, এবার ব্যবসায় লাভ হবেই। আমি হাসলাম না, কাঁদিনি। শুধু ভাবলাম, যদি ঈশ্বর এতই লোভী হন, তবে শয়তান কেমন?
শুনেছি, ঈশ্বর বিচার করবেন। ভালোমন্দের হিসেব রাখেন।
কিন্তু এই যে ধর্ষিতা শিশু, এই যে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া গরিব পরিবার, এদের অপরাধ কী ছিল?
আমাকে বলা হলো, এটা পরীক্ষা।
তাহলে প্রশ্ন করছি, কাকে প্রমাণ দিচ্ছে তারা? কোন পরীক্ষায়, কাদের সামনে, কিসের জন্য?
আমাকে বলা হলো, জন্মপূর্ব পাপের শাস্তি।
আমি বললাম, বিচার যদি হয় অতীতের নামে, তবে ভবিষ্যৎ জন্মে কী লাভ?
আমি আরও বুঝতে পারলাম, ঈশ্বরকে চুপ করানোর জন্য চারপাশে অনেক কথা বানানো হয়েছে। ঈশ্বর যেন এক অনুপস্থিত শিক্ষক, তাঁর নামে চলছে স্কুল, চলছে বেতন, চলছে শাসন। কিন্তু তিনি উপস্থিত হন না, কারণ প্রশ্ন করলে ক্লাস থেকেই বের করে দেয় সবাই।
আমি একদিন একটা দরজায় টোকা দিলাম। ভেতর থেকে বলল, ভক্তি নিয়ে এসো।
আমি বললাম, ভক্তি নেই, প্রশ্ন আছে।
তারা দরজা বন্ধ করে দিলো।
আমি বুঝলাম, ঈশ্বর নয়, ভয়ই এই সমাজের প্রধান ঈশ্বর।
ভয়! হারানোর, তিরস্কারের, মৃত্যুর।
তাই আমরা ঈশ্বর গড়েছি, যাতে ভয়কে শান্ত রাখা যায়।
আমরা নিয়ম বানিয়েছি, উৎসব বানিয়েছি, রীতিনীতি বানিয়েছি, যাতে ঈশ্বর খুশি থাকেন।
কিন্তু আমরা একবারও জিজ্ঞাসা করিনি, সত্যিই কি তিনি আছেন?
অন্য ধর্মের লোক বলল, আমার ঈশ্বরই আসল।
আরেকজন বলল, তোমারটা মিথ্যা, আমারটাই সত্য।
দুইজনই মারামারি করল। রক্ত পড়ল মাটিতে।
আর আকাশে বসে যদি সত্যিই কেউ থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই কাঁদলেন।
আমার প্রশ্ন বাড়তে থাকলো।
যদি ঈশ্বর সবজান্তা হন, তাহলে তিনি দোষীদের আগে থেকে থামান না কেন?
যদি তিনি দয়ালু হন, তাহলে এত কষ্টের কী দরকার ছিল?
যদি তিনি বিচারক হন, তাহলে ধর্মের নামে খুনের বিচার কে করবে?
একজন বলল, তুমি বেশি ভাবো।
আমি বললাম, তুমি কম ভাবো।
একজন বলল, তুমি ঈশ্বর অবমাননা করছো।
আমি বললাম, তুমি ঈশ্বরকে প্রশ্নবিদ্ধ করছো, এত দুর্বল ধরে নিয়ে।
আমার স্ট্যাটাস এখানে থামে না। আমি কেবল বলতে চেয়েছি-
বিশ্বাস হোক, তবে প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে।
ভক্তি হোক, তবে বুদ্ধির আলোয় আলোকিত।
ঈশ্বর হোক, তবে মানুষের ভেতরে, বাইরের ইমারতে নয়।
আমি জানি না, সত্যিই কেউ আছেন কিনা।
কিন্তু যদি থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই ভয় চান না, প্রশ্ন চান।
তিনি নিশ্চয়ই প্রমাণ চান না, ভালোবাসা চান।
আমিও তাই চেয়েছিলাম।
শুধু জানতে।
#qbsujon ,#QB_SUJON
#আমি_শুধু_জানতে_চেয়েছিলাম
#ধর্মেরশেষঅস্ত্রভয়
#ভক্তিনয়যুক্তি
#FaithVsFear
#QuestionEverything

