➤ কালাম সূত্রের হত্যা...

গৌতম বুদ্ধের কালাম সূত্র আজ এক করুণ বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার, যেখানে এর প্রকৃত নিরপেক্ষ নির্যাসকে খণ্ডিত করে সুবিধাবাদী ব্যাখ্যার সংকীর্ণতায় বলী দেওয়া হচ্ছে। যে মহান দার্শনিক ভিত্তি মানুষকে শিখিয়েছিল সকল প্রকার অন্ধত্ব, ঐতিহ্য, শাস্ত্র এবং এমনকি নিজস্ব গূঢ় যৌক্তিক অনুমানের ঊর্ধ্বে উঠে পরম নিরপেক্ষতায় সত্যকে অনুসন্ধান করতে, সেই সূত্রকেই আজ একপাক্ষিক স্বার্থে ব্যবহার করে তার মূল নির্যাসকে বিনাশ করা হচ্ছে। এই হত্যার প্রধান কারিগর একদিকে যেমন সেই সব আধ্যাত্মিকতাবাদী, যারা বুদ্ধের এই শিক্ষাকে কেবল নিজেদের অলৌকিক বিশ্বাসের রক্ষাকবচ বানাতে চান, অন্যদিকে তেমনি সেই সব আধুনিক চরমপন্থী জড়বাদী, যারা এই সূত্রকে তাদের উচ্ছেদবাদী মতাদর্শের একমাত্র বৈধ দলিল হিসেবে প্রচার করেন। বুদ্ধ যখন কেশপুত্তীয় কালামদের দশটি বর্জনীয় মানদণ্ড শিখিয়েছিলেন, তখন তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বিচারবুদ্ধিকে চিরতরে মুক্ত করা, কোনো নির্দিষ্ট ‘ইজম’ বা মতবাদের খাঁচায় বন্দি করা নয়। বুদ্ধ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দশটি প্রমাণের ভিত্তি, যেমন লোকশ্রুতি, পরম্পরা, ধর্মগ্রন্থ বা কেবল তর্কের খাতিরে কোনো কিছু গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানের বিশ্লেষকরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই সূত্রের ‘চতুবিধ আশ্বাস’ থেকে কেবল সেই অংশটুকুই জনসমক্ষে আনেন যা তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের অনুকূলে যায়। জড়বাদীরা যখন এই সূত্র টেনে দাবি করেন যে মৃত্যুর পর নিশ্চয়ই কিছু নেই এবং বুদ্ধ পরকালকে উড়িয়ে দিয়েছেন, তখন তারা বুদ্ধের সেই প্রাথমিক নির্দেশটিই সরাসরি লঙ্ঘন করেন, যেখানে তিনি কেবল অনুমানের বশবর্তী হয়ে বা নিজস্ব মতবাদের সাথে মিল আছে বলেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ, মৃত্যুর পর চেতনার সম্পূর্ণ বিনাশ হওয়াও একটি অপ্রমাণিত অনুমান এবং এক প্রকার অন্ধ একদেশদর্শিতা মাত্র। বুদ্ধের নিরপেক্ষতা ছিল এক বিশাল আকাশপ্রতীম অবস্থান, যেখানে তিনি পরকাল থাকা বা না থাকার নিষ্ফল তর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না করে, তাদের বর্তমান মুহূর্তের নৈতিক বিশুদ্ধতা ও মৈত্রীর দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এখানে উভয় পক্ষকেই কঠোরভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন যে, কালাম সূত্র কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের বিজয় ঘোষণা করার জন্য রচিত হয়নি। আধ্যাত্মিকতাবাদীরা যদি মনে করেন এই সূত্র তাদের অন্ধ ভক্তিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে তারা ভুল করছেন, কারণ বুদ্ধ এখানে শাস্ত্রীয় দোহাইকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার জড়বাদীরা যদি মনে করেন এই সূত্র তাদের ‘জড়তা’ বা ‘উচ্ছেদবাদ’-এর সার্টিফিকেট, তবে তারাও বুদ্ধের সেই ‘যদি’ (Ce) শব্দটির গভীরতাকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। বুদ্ধ সেখানে একটি নিরপেক্ষ গাণিতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন মাত্র, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। বুদ্ধের সেই মহান মধ্যপন্থাকে যখন কেউ জোরপূর্বক একপাক্ষিক ‘জড়বাদ’ কিংবা ‘আস্তিক্যবাদ’ বলে দাবি করে, তখন আসলে কালাম সূত্রের সেই স্বাধীন অনুসন্ধানের চেতনাকেই হত্যা করা হয়। বুদ্ধ মৃত্যুকে একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রেখেই মানুষকে বর্তমানের কর্মে মনোযোগী হতে বলেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে ‘মৃত্যুর পর সব শেষ’, এই উচ্ছেদবাদী ধারণাটি যেমন মানুষকে দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলতে পারে, তেমনি ‘সবই আগে থেকে নির্ধারিত’ যা পূর্ব কর্মের ফলে হয়েছে, এই শাশ্বতবাদী ধারণাও মানুষকে বিচারহীন অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। কালাম সূত্রের এই অপব্যাখ্যা আসলে একটি দার্শনিক অপরাধ, কারণ এটি বুদ্ধের ‘বিচয়’ বা ইনভেস্টিগেশন ধর্মী শিক্ষাকে একটি মৃত ও একঘেয়ে তত্ত্বে পরিণত করে। বুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একটি আয়নার মতো যেখানে কেবল সত্যেরই প্রতিফলন ঘটে, অনুসন্ধান ঘটে, সেখানে কোনো ব্যক্তিগত পূর্বানুমানের স্থান নেই। জড়বাদীরা যখন কালাম সূত্র টেনে পরকালকে উড়িয়ে দেওয়ার আস্ফালন দেখান, তারা আসলে বুদ্ধের সেই সতর্কবাণীই ভুলে যান, যে কোনো কিছুকেই অকাট্য প্রমাণ ছাড়া এবং নিজের অভিজ্ঞতায় আসা সরাসরি জ্ঞান ছাড়া চিরন্তন সত্য বলে দাবি করা এক প্রকার মোহ।
কালাম সূত্র কোনো জড়বাদী ইশতেহার নয়, আবার এটি কোনো অলৌকিক বিশ্বাসের দলিলও নয়। এটি হলো মানুষের চেতনার চূড়ান্ত স্বাধীন অনুসন্ধানের এক মহাপত্র, যা আজ স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যার ভিড়ে তার গাম্ভীর্য হারাচ্ছে। বুদ্ধের ‘চতুবিধ আশ্বাস’এর মূলে নিহিত ছিল পরকাল থাকুক বা না থাকুক, নৈতিক জীবন যাপন করাই হলো সবথেকে নিরাপদ ও বুদ্ধিদীপ্ত পথ। যখন কোনো পক্ষ কেবল নিজেদের সুবিধামতো অংশটুকু তুলে ধরে উল্লাস প্রকাশ করে, তখন তারা বুদ্ধের সেই সামগ্রিক সত্যকে অস্বীকার করে। এই ভারসাম্যটি নষ্ট করাই হলো কালাম সূত্রের প্রকৃত হত্যা। বুদ্ধ কোনো পক্ষ নেওয়ার জন্য বা কোনো একপক্ষকে জয়ী করার জন্য এই সূত্র প্রচার করেননি, বরং তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন সব ধরনের ‘ইজম’ থেকে মুক্ত হয়ে নিজের প্রজ্ঞা জাগ্রত করে। যখনই এই সূত্রকে কোনো একপাক্ষিক মতাদর্শের হাতিয়ার বানানো হয়, তখনই এর মধ্যপন্থা বা নিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বুদ্ধের শিক্ষা কোনো ধ্বংসাত্মক উচ্ছেদবাদ ছিল না, আবার তা কোনো যুক্তিহীন আধ্যাত্মিকতাও ছিল না, তা ছিল অসীম প্রজ্ঞার এক জ্যোতি যা কোনো নির্দিষ্ট দলের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এখানে সেই সব পক্ষকে হুঁশিয়ার করা প্রয়োজন, যারা বুদ্ধের নাম ব্যবহার করে নিজেদের চিন্তাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। সত্য উন্মুক্ত, এবং সেই উন্মুক্ত সত্যকে জানার জন্য প্রয়োজন পক্ষপাতহীন এক মন, যা কালাম সূত্রের প্রকৃত দাবি। এর বাইরে গিয়ে কেবল নিজের সুবিধামতো বুদ্ধকে ব্যাখ্যা করা মানেই হলো সেই মহান আলোকবর্তিকাকে নিভিয়ে ফেলা এবং কালাম সূত্রের পবিত্র নির্যাসকে হত্যা করা। বুদ্ধের নিরপেক্ষতা মানে কোনো পক্ষে না থাকা নয়, বরং সকল পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সত্য অনুসন্ধানের মুখোমুখি হওয়া।

নির্বাণ, না কি নিহিলিজম: শূন্যতার বুকে দাঁড়িয়ে দর্শনের দ্বৈত আত্মদর্শন

শূন্যতা শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে এক ধরনের ভয়, দ্বিধা বা অস্তিত্বহীনতার অনুভব জেগে ওঠে। অথচ এই একই শূন্যতা দর্শনের পরিসরে কখনো আশ্রয়, কখনো মুক্তি, আবার কখনো এক ধরণের অস্তিত্ব-নাকচের কাব্যিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এই প্রবন্ধটি সেই শূন্যতার দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টি দেয়, পাশ্চাত্যের নিহিলিজম এবং প্রাচ্যের বৌদ্ধ নির্বাণ। একদিকে আছে ‘সবই অর্থহীন’ বলে ঘোষণা দেওয়া এক ধ্বংসচিন্তা, অন্যদিকে আছে ‘সবই অনিত্য, অনাত্মা’, এই উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তৃষ্ণামুক্তি ও মুক্তির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এ দুটির মাঝে পার্থক্য কি কেবল ভাষার, নাকি দৃষ্টিভঙ্গির? কিংবা এই দুইয়ের মধ্যে কোনো গভীর গোপন আত্মীয়তা আছে কি? লেখাটি ঠিক সেই দ্বিধা ও গভীরতায় পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়, নির্বাণ ও নিহিলিজমের অনির্ণেয় সংলাপে। নির্বাণ ও নিহিলিজম, শব্দ দুটি উচ্চারণেই যেন এক ধরণের রুদ্ধশ্বাস শূন্যতার আভাস মেলে। কিন্তু বাস্তবতা কি এতটা সরল? অথবা বলা ভালো, দর্শন কি কখনো সরল হতে পারে? এই প্রশ্ন নিয়েই আমাদের আজকের বিশ্লেষণ। নির্বাণ শব্দটি এসেছে পালি ভাষা থেকে, যার সংস্কৃত প্রতিশব্দ ‘निर्वाण’। বৌদ্ধ দর্শনে এর অর্থ এক ধরণের সর্বাঙ্গীন নির্বাপিত অবস্থা, আত্মতৃপ্তি নয়, বরং তৃষ্ণার সম্পূর্ণ অবসান, লোভ-ঘৃণা-মোহের অনুপস্থিতি। অন্যদিকে, পাশ্চাত্য দর্শনে ‘nihilism’ হলো এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, নৈতিকতার কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই, এমনকি সত্য বা জ্ঞানও সন্দেহসাপেক্ষ। এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই দুই অবস্থার মাঝে কি কোনো মিল আছে, নাকি বিরাট এক দার্শনিক বিভাজন? কেউ কেউ বলেন, বুদ্ধের নির্বাণ হলো আত্ম-অতিক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে নিজস্বতা লুপ্ত হয়, কিন্তু একধরণের শ্রেষ্ঠতর অস্তিত্বে পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে, নিহিলিজম হলো আত্ম-ধ্বংসের এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তিত্ব শুধু নিজেই নয়, পুরো বাস্তবতাকেই অর্থহীন মনে করে। তবে এই কথাগুলো কেবল সংজ্ঞার খেলায় আটকে থাকলে ভুল হবে। বৌদ্ধ দর্শনে ‘অনাত্মবাদ’ বা ‘পুথগল-শূন্যতা’ এমন এক অবস্থান তৈরি করে, যেখানে আত্মা বলে কিছু নেই, বরং ‘পঞ্চস্কন্ধ’ বা পাঁচটি উপাদান মাত্র। এই অনাত্মবাদের ভিত্তিতেই নির্বাণ বোঝা যায়, যেখানে ‘আমি’র মোহ ভেঙে পড়ে। কিন্তু এই আত্মহীনতার দর্শন কি আসলে অস্তিত্বহীনতার অনুমোদন দেয়? নির্বাণ যদি হয় শূন্যতার উপলব্ধি, তবে নিহিলিজম সেই শূন্যতার ভয়। নির্বাণ যেখানে বলছে, সব কিছু অনিত্য, তাই মুক্তি তৃষ্ণাহীনতায়; সেখানে নিহিলিজম বলছে, সব অনর্থক, তাই আত্মবিনাশ অনিবার্য। তবে কেউ কেউ বলেন, বুদ্ধ নিজেও ছিলেন এক প্রকার ‘র‌্যাডিকাল রিয়ালিস্ট’; তিনি ‘সত্য’কে চিরস্থায়ী মানতেন না, আবার পুরোপুরি নাকচও করতেন না। সেইখানে নিহিলিজম আর নির্বাণের মাঝে একটি সূক্ষ্ম রেখা, যা একদিকে টানে অস্তিত্বের অস্বীকারের দিকে, অন্যদিকে টানে নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ চেতনার দিকে। নির্বাণ এক প্রকার দার্শনিক প্রতিশ্রুতি, তুমি নিজের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারো। নিহিলিজম হলো সেই প্রতিশ্রুতির অপত্যাজন, তুমি কিছুতেই যেতে পারো না, কারণ যাওয়ার কোনো অর্থ নেই। আবার, জীবনের প্রশ্নে যখন বলা হয়, “সব অনিত্য, সব দুঃখ, সব অনাত্মা,” তখন এক ধরণের অপার শূন্যতার অনুভূতি জন্ম নেয়। এই শূন্যতা (sunyata) যদি ঠিকভাবে উপলব্ধ হয়, তখন তা সৃষ্টি করে এক ধরণের মৈত্রি, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধ। আর যদি এই শূন্যতাকে ঠিকভাবে ধরা না যায়, তখন তা রূপ নেয় ঊনতা, বিষণ্নতা এবং অনস্তিত্ববাদে। এইখানেই নিহিলিজম ও নির্বাণের প্রকৃত ফারাক। নির্বাণ হলো শূন্যতা থেকে দায়বদ্ধতার জন্ম, আর নিহিলিজম হলো শূন্যতা থেকে অবসাদের বিস্তার। একদিকে বুদ্ধ বলছেন, “তুমি কিছু নও, তাই তুমি সব হতে পারো।” অন্যদিকে নিহিলিস্ট বলছে, “তুমি কিছু নও, এবং তাই কিছুই হতে পারবে না।” তাই, প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয়, অস্তিত্বগতও, তুমি কি সেই শূন্যতার মুখোমুখি হতে পারো, যা কিছু না হয়েও সবকিছু ধারণ করে? জগৎ এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ্যের নাট্যমঞ্চ, যেখানে দৃশ্যমান প্রতিটি ঘটনাই একেকটি ভাষাহীন সংলাপ, আর মানুষের মন সেই সংলাপ বোঝার নিরন্তর চেষ্টা। এখানে সত্য বলে কিছু নেই, আছে শুধু ব্যাখ্যার খেলা। এই ব্যাখ্যাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে বিশ্বাস, গড়ে ওঠে দর্শন, গড়ে ওঠে জীবন-ব্যবস্থা। অথচ এই ব্যাখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য প্রশ্ন, যা কখনো মুখ ফুটে বলে না: “কেন? কিভাবে? কার জন্য?” এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে নাস্তিকতা, সংশয়বাদ, নির্বাণবাদ, আর তারই প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও চিরন্তন সত্যের দাবি করা দর্শনগুলো। বৌদ্ধ ধর্ম, এই পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও সংযত ধর্মব্যবস্থা, একদিকে যেমন আত্মনিবৃত্তি, দয়া ও শূন্যতার মর্মবাণী শোনায়, অন্যদিকে ঠিক তেমনই সে সৃষ্টি করেছে এক গভীর নির্বাণের জগত, যার প্রতিটি স্তম্ভ চিন্তার, ত্যাগের, ও রহস্যময় নৈঃসঙ্গ্যের উপর দাঁড়ানো। একে নির্বাণ বলা যায় কি না, সেটাই প্রশ্ন। কারণ বৌদ্ধ ধর্ম, এক অর্থে, নিরাকারতা ও অনাসক্তির নামে এক বিশাল আধ্যাত্মিক কাঠামো নির্মাণ করেছে, যা নিজেই নিজেকে নাকচ করার মাঝেও টিকে আছে। এই নিজেকে নাকচ করেও টিকে থাকার অবস্থানটাই আসলে নির্বাণবাদের সঙ্গে এক ধরনের গোপন আত্মীয়তার জন্ম দেয়। নির্বাণবাদ বা Deconstruction, আমাদের শেখায় কিভাবে ভাষা, ধারণা ও প্রতিষ্ঠিত সত্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বিপরীতমুখী দ্বন্দ্ব। Derrida-এর ভাষায়, কোনো পাঠই নিরপেক্ষ নয়, কারণ প্রতিটি শব্দের মধ্যে এক ধরনের ভাঙনের সম্ভাবনা লুকানো থাকে। ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই যখন বৌদ্ধ ধর্মের দিকে তাকানো হয়, তখন দেখা যায়, বুদ্ধ নিজে কোনও চূড়ান্ত সত্যের ঘোষণা দেননি, বরং সব ধরনের চূড়ান্ততাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। তিনি আত্মার অস্তিত্বকে নাকচ করেছেন, ঈশ্বরের ধারণাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন, এমনকি নিজেকেও পরিত্রাতা বলেননি। অথচ সেই ‘নাকচ করা’ বা ‘নিষেধ’ এর মাঝেই গড়ে উঠেছে এক জটিল ধর্মব্যবস্থা, এক বিশাল ত্রিপিটক সাহিত্য, হাজার বছরের ধ্যান ও সাধনার কাঠামো। প্রশ্ন আসে, তাহলে কি বুদ্ধ নিজেই অনিচ্ছাকৃত নির্মাতা? অথবা নির্মাণের বিপক্ষে থেকেও নির্মাণের দিকে ঠেলে দেওয়া এক অসামান্য দার্শনিক? এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বৌদ্ধ ধর্ম নিজের অজান্তেই একটি নির্মাণ। এমনকি ‘শূন্যতা’ নামক ধারণাটিও এক ধরনের গূঢ় নির্মাণ; কারণ শূন্যতাও যদি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝানো হয়, তবে তা আর শূন্য থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি অর্থপূর্ণ নির্মিত কাঠামো। Derrida যেভাবে বলেন, “différance never arrives fully,” ঠিক তেমনই বৌদ্ধ ধর্মের শূন্যতাও কখনো পুরোপুরি ধরা যায় না, বরং তা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ছায়ার মতো সরে যায়। তবে এখানেই রয়েছে দ্বিধা। Derrida নির্মাণকে ভাঙতে বলেন, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম ভাঙে না, বরং এক নতুন কাঠামো দাঁড় করায়, ধর্মচক্র, সংঘ, সাধনা, নির্বাণ। Derrida ভাষার ঘূর্ণিপাকে ঢুকে পড়েন, আর বুদ্ধ সংজ্ঞার বাইরে বের হয়ে যেতে চান। Derrida প্রশ্ন করেন শব্দের ভেতরের দ্যোতনার সত্যতা, আর বুদ্ধ প্রশ্ন করেন সমস্ত সত্ত্বার স্থায়ীত্বকে। এই দুই প্রশ্নকারী যেন দুটি সমান্তরাল পথ, একটি পশ্চিমা, একটি প্রাচ্য; কিন্তু দুজনেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক অসীম অনিশ্চয়তার দিকে। বৌদ্ধ ধর্ম এখানে নির্মাণবাদী চিন্তার সহযাত্রী হলেও পুরোপুরি নির্মাণ নয়, এমন নয় যে বুদ্ধ Derrida-র মতো ভাষা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন বা পাঠের মধ্যে নিহিত শক্তিকে বিশ্লেষণ করেছেন। বুদ্ধ বরং জীবন ও দুঃখের কারণ অনুসন্ধান করতে করতে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী নির্জনতার দিকে হেঁটে গেছেন। Derrida থাকেন পাঠে, বুদ্ধ থাকেন প্রত্যক্ষানুভবে। Derrida খনন করেন শূন্যতা শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে এক ধরনের ভয়, দ্বিধা বা অস্তিত্বহীনতার অনুভব জেগে ওঠে। অথচ এই একই শূন্যতা দর্শনের পরিসরে কখনো আশ্রয়, কখনো মুক্তি, আবার কখনো এক ধরণের অস্তিত্ব-নাকচের কাব্যিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এই প্রবন্ধটি সেই শূন্যতার দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টি দেয়, পাশ্চাত্যের নিহিলিজম এবং প্রাচ্যের বৌদ্ধ নির্বাণ। একদিকে আছে ‘সবই অর্থহীন’ বলে ঘোষণা দেওয়া এক ধ্বংসচিন্তা, অন্যদিকে আছে ‘সবই অনিত্য, অনাত্মা’, এই উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তৃষ্ণামুক্তি ও মুক্তির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এ দুটির মাঝে পার্থক্য কি কেবল ভাষার, নাকি দৃষ্টিভঙ্গির? কিংবা এই দুইয়ের মধ্যে কোনো গভীর গোপন আত্মীয়তা আছে কি? লেখাটি ঠিক সেই দ্বিধা ও গভীরতায় পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়, নির্বাণ ও নিহিলিজমের অনির্ণেয় সংলাপে। নির্বাণ ও নিহিলিজম, শব্দ দুটি উচ্চারণেই যেন এক ধরণের রুদ্ধশ্বাস শূন্যতার আভাস মেলে। কিন্তু বাস্তবতা কি এতটা সরল? অথবা বলা ভালো, দর্শন কি কখনো সরল হতে পারে? এই প্রশ্ন নিয়েই আমাদের আজকের বিশ্লেষণ। নির্বাণ শব্দটি এসেছে পালি ভাষা থেকে, যার সংস্কৃত প্রতিশব্দ ‘निर्वाण’। বৌদ্ধ দর্শনে এর অর্থ এক ধরণের সর্বাঙ্গীন নির্বাপিত অবস্থা, আত্মতৃপ্তি নয়, বরং তৃষ্ণার সম্পূর্ণ অবসান, লোভ-ঘৃণা-মোহের অনুপস্থিতি। অন্যদিকে, পাশ্চাত্য দর্শনে ‘nihilism’ হলো এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, নৈতিকতার কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই, এমনকি সত্য বা জ্ঞানও সন্দেহসাপেক্ষ। এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই দুই অবস্থার মাঝে কি কোনো মিল আছে, নাকি বিরাট এক দার্শনিক বিভাজন? কেউ কেউ বলেন, বুদ্ধের নির্বাণ হলো আত্ম-অতিক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে নিজস্বতা লুপ্ত হয়, কিন্তু একধরণের শ্রেষ্ঠতর অস্তিত্বে পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে, নিহিলিজম হলো আত্ম-ধ্বংসের এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তিত্ব শুধু নিজেই নয়, পুরো বাস্তবতাকেই অর্থহীন মনে করে। তবে এই কথাগুলো কেবল সংজ্ঞার খেলায় আটকে থাকলে ভুল হবে। বৌদ্ধ দর্শনে ‘অনাত্মবাদ’ বা ‘পুথগল-শূন্যতা’ এমন এক অবস্থান তৈরি করে, যেখানে আত্মা বলে কিছু নেই, বরং ‘পঞ্চস্কন্ধ’ বা পাঁচটি উপাদান মাত্র। এই অনাত্মবাদের ভিত্তিতেই নির্বাণ বোঝা যায়, যেখানে ‘আমি’র মোহ ভেঙে পড়ে। কিন্তু এই আত্মহীনতার দর্শন কি আসলে অস্তিত্বহীনতার অনুমোদন দেয়? নির্বাণ যদি হয় শূন্যতার উপলব্ধি, তবে নিহিলিজম সেই শূন্যতার ভয়। নির্বাণ যেখানে বলছে, সব কিছু অনিত্য, তাই মুক্তি তৃষ্ণাহীনতায়; সেখানে নিহিলিজম বলছে, সব অনর্থক, তাই আত্মবিনাশ অনিবার্য। তবে কেউ কেউ বলেন, বুদ্ধ নিজেও ছিলেন এক প্রকার ‘র‌্যাডিকাল রিয়ালিস্ট’; তিনি ‘সত্য’কে চিরস্থায়ী মানতেন না, আবার পুরোপুরি নাকচও করতেন না। সেইখানে নিহিলিজম আর নির্বাণের মাঝে একটি সূক্ষ্ম রেখা, যা একদিকে টানে অস্তিত্বের অস্বীকারের দিকে, অন্যদিকে টানে নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ চেতনার দিকে। নির্বাণ এক প্রকার দার্শনিক প্রতিশ্রুতি, তুমি নিজের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারো। নিহিলিজম হলো সেই প্রতিশ্রুতির অপত্যাজন, তুমি কিছুতেই যেতে পারো না, কারণ যাওয়ার কোনো অর্থ নেই। আবার, জীবনের প্রশ্নে যখন বলা হয়, “সব অনিত্য, সব দুঃখ, সব অনাত্মা,” তখন এক ধরণের অপার শূন্যতার অনুভূতি জন্ম নেয়। এই শূন্যতা (sunyata) যদি ঠিকভাবে উপলব্ধ হয়, তখন তা সৃষ্টি করে এক ধরণের মৈত্রি, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধ। আর যদি এই শূন্যতাকে ঠিকভাবে ধরা না যায়, তখন তা রূপ নেয় ঊনতা, বিষণ্নতা এবং অনস্তিত্ববাদে। এইখানেই নিহিলিজম ও নির্বাণের প্রকৃত ফারাক। নির্বাণ হলো শূন্যতা থেকে দায়বদ্ধতার জন্ম, আর নিহিলিজম হলো শূন্যতা থেকে অবসাদের বিস্তার। একদিকে বুদ্ধ বলছেন, “তুমি কিছু নও, তাই তুমি সব হতে পারো।” অন্যদিকে নিহিলিস্ট বলছে, “তুমি কিছু নও, এবং তাই কিছুই হতে পারবে না।” তাই, প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয়, অস্তিত্বগতও, তুমি কি সেই শূন্যতার মুখোমুখি হতে পারো, যা কিছু না হয়েও সবকিছু ধারণ করে? জগৎ এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ্যের নাট্যমঞ্চ, যেখানে দৃশ্যমান প্রতিটি ঘটনাই একেকটি ভাষাহীন সংলাপ, আর মানুষের মন সেই সংলাপ বোঝার নিরন্তর চেষ্টা। এখানে সত্য বলে কিছু নেই, আছে শুধু ব্যাখ্যার খেলা। এই ব্যাখ্যাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে বিশ্বাস, গড়ে ওঠে দর্শন, গড়ে ওঠে জীবন-ব্যবস্থা। অথচ এই ব্যাখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য প্রশ্ন, যা কখনো মুখ ফুটে বলে না: “কেন? কিভাবে? কার জন্য?” এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে নাস্তিকতা, সংশয়বাদ, নির্বাণবাদ, আর তারই প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও চিরন্তন সত্যের দাবি করা দর্শনগুলো। বৌদ্ধ ধর্ম, এই পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও সংযত ধর্মব্যবস্থা, একদিকে যেমন আত্মনিবৃত্তি, দয়া ও শূন্যতার মর্মবাণী শোনায়, অন্যদিকে ঠিক তেমনই সে সৃষ্টি করেছে এক গভীর নির্বাণের জগত, যার প্রতিটি স্তম্ভ চিন্তার, ত্যাগের, ও রহস্যময় নৈঃসঙ্গ্যের উপর দাঁড়ানো। একে নির্বাণ বলা যায় কি না, সেটাই প্রশ্ন। কারণ বৌদ্ধ ধর্ম, এক অর্থে, নিরাকারতা ও অনাসক্তির নামে এক বিশাল আধ্যাত্মিক কাঠামো নির্মাণ করেছে, যা নিজেই নিজেকে নাকচ করার মাঝেও টিকে আছে। এই নিজেকে নাকচ করেও টিকে থাকার অবস্থানটাই আসলে নির্বাণবাদের সঙ্গে এক ধরনের গোপন আত্মীয়তার জন্ম দেয়। নির্বাণবাদ বা Deconstruction, আমাদের শেখায় কিভাবে ভাষা, ধারণা ও প্রতিষ্ঠিত সত্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বিপরীতমুখী দ্বন্দ্ব। Derrida-এর ভাষায়, কোনো পাঠই নিরপেক্ষ নয়, কারণ প্রতিটি শব্দের মধ্যে এক ধরনের ভাঙনের সম্ভাবনা লুকানো থাকে। ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই যখন বৌদ্ধ ধর্মের দিকে তাকানো হয়, তখন দেখা যায়, বুদ্ধ নিজে কোনও চূড়ান্ত সত্যের ঘোষণা দেননি, বরং সব ধরনের চূড়ান্ততাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। তিনি আত্মার অস্তিত্বকে নাকচ করেছেন, ঈশ্বরের ধারণাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন, এমনকি নিজেকেও পরিত্রাতা বলেননি। অথচ সেই ‘নাকচ করা’ বা ‘নিষেধ’ এর মাঝেই গড়ে উঠেছে এক জটিল ধর্মব্যবস্থা, এক বিশাল ত্রিপিটক সাহিত্য, হাজার বছরের ধ্যান ও সাধনার কাঠামো। প্রশ্ন আসে, তাহলে কি বুদ্ধ নিজেই অনিচ্ছাকৃত নির্মাতা? অথবা নির্মাণের বিপক্ষে থেকেও নির্মাণের দিকে ঠেলে দেওয়া এক অসামান্য দার্শনিক? এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বৌদ্ধ ধর্ম নিজের অজান্তেই একটি নির্মাণ। এমনকি ‘শূন্যতা’ নামক ধারণাটিও এক ধরনের গূঢ় নির্মাণ; কারণ শূন্যতাও যদি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝানো হয়, তবে তা আর শূন্য থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি অর্থপূর্ণ নির্মিত কাঠামো। Derrida যেভাবে বলেন, “différance never arrives fully,” ঠিক তেমনই বৌদ্ধ ধর্মের শূন্যতাও কখনো পুরোপুরি ধরা যায় না, বরং তা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ছায়ার মতো সরে যায়। তবে এখানেই রয়েছে দ্বিধা। Derrida নির্মাণকে ভাঙতে বলেন, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম ভাঙে না, বরং এক নতুন কাঠামো দাঁড় করায়, ধর্মচক্র, সংঘ, সাধনা, নির্বাণ। Derrida ভাষার ঘূর্ণিপাকে ঢুকে পড়েন, আর বুদ্ধ সংজ্ঞার বাইরে বের হয়ে যেতে চান। Derrida প্রশ্ন করেন শব্দের ভেতরের দ্যোতনার সত্যতা, আর বুদ্ধ প্রশ্ন করেন সমস্ত সত্ত্বার স্থায়ীত্বকে। এই দুই প্রশ্নকারী যেন দুটি সমান্তরাল পথ, একটি পশ্চিমা, একটি প্রাচ্য; কিন্তু দুজনেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক অসীম অনিশ্চয়তার দিকে। বৌদ্ধ ধর্ম এখানে নির্মাণবাদী চিন্তার সহযাত্রী হলেও পুরোপুরি নির্মাণ নয়, এমন নয় যে বুদ্ধ Derrida-র মতো ভাষা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন বা পাঠের মধ্যে নিহিত শক্তিকে বিশ্লেষণ

নির্বাণ ও চার্বাক দর্শন: একই গন্তব্যের ভিন্ন পথ?

কিউ.বি সুজন

ভারতের দার্শনিক ইতিহাসে চার্বাক ও গৌতম বুদ্ধের নির্বাণবাদকে সাধারণত বিপরীত দুই মেরু বলা হয়, একদিকে কড়া ভৌতিকতা, অন্যদিকে কথিত আধ্যাত্মিক মুক্তি। কিন্তু শেষ গন্তব্য যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, ব্যাধি নেই, মৃত্যু নেই এই ঘোষণাটি সামনে এনে যদি দুদর্শনের ফল তুলনা করা হয়, দেখা যায় আশ্চর্য এক সাদৃশ্য। চার্বাকের সোজাসাপ্টা সব শেষ এবং বৌদ্ধ নির্বাণের সব নিবে গেছে দুটিই সংসারধর্মী অস্তিত্বের অবসান নির্দেশ করে। পার্থক্য যেন কেবল শব্দের পোশাক। চার্বাক বলেন খোলাখুলি, বুদ্ধ বলেন কৌশলে। এই লেখায় আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্বাণ পূর্ব নৈতিক বা কারণ কার্য, পুনর্জন্ম, কর্মফল ইত্যাদি আলোচনায় যাচ্ছি না। কেবল চূড়ান্ত অবস্থাটিকেই বিচার করছি, ঘটনার শেষ ছবি কী। ঠিক এই শেষ ছবিটিই দর্শনকে সবচেয়ে নির্মমভাবে খোলাসা করে দেয়, কারণ সেখানে শব্দের জটিলতা ফুরোয়, থাকে কেবল ফল।

চার্বাকের বক্তব্যটি অত্যন্ত স্বচ্ছ। আত্মা বলে কোন স্বতন্ত্র সত্তা নেই; দেহই চেতনাকে বহন করে; দেহ যন্ত্র থেমে গেলে আলো নিভে যাওয়ার মতো চেতনা নিভে যায় এবং এখানেই সমাপ্তি। কোনো পুনর্জন্ম নয়, কোনো পরলোক নয়, কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যাও নয়। এই ভঙ্গি দার্শনিক সাহসের। এখানে আবেগ নেই, অলঙ্কার নেই, দায়বদ্ধ যুক্তির বাইরে যাবার লুকোনো দরজা নেই। ভৌতিকতার এই বর্ণনায় অস্তিত্বের শেষ মানে সত্যিই শেষ। চূড়ান্ত নীরবতা, যাচাই পরীক্ষার দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতাশূন্য এক অবসান। এই অবস্থাকে যে ই নাম দেওয়া হোক, এর কার্যকর অর্থ দাঁড়ায় ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার সব ধারাই ছিন্ন।

এবার দেখা যাক নির্বাণের বয়ান কী দিকে ইঙ্গিত করে। বৌদ্ধ সাহিত্যে নির্বাণকে বলা হয় এমন এক পরিসর যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, অর্থাৎ যে প্রবাহ ছিল তা সেখানেই থেমে যায়। শব্দের পক্ষে নির্বাণ মানে নিভে যাওয়া। কিন্তু বর্ণনার সময় বলা হয়, একে অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কোনো দাবিতেই শামিল করা যায় না; এটিকে বলা হয় অজাত, অমৃত, অসংখত। এখানেই তর্কের সূক্ষ্ম কেন্দ্র। যদি আপনি বলেন এটি না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব, তবে আপনি প্রথাগত যুক্তিতত্ত্বের বাইরে এক তৃতীয় বর্গ হাজির করছেন, যা বাস্তবিক বৈশিষ্ট্য দেখাতে না পারলে ভাষামাত্রে পরিণত হয়। আর যদি বলেন, নির্বাণ অবস্থা, তাতে প্রবেশ করলে জন্ম জরা মৃত্যু শূন্য, তবে ফলের দিক থেকে এটি চার্বাকের ঘোষিত শূন্যতার সমান। দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা চূড়ান্তভাবে লোপ পায়। এখানে অবস্থা শব্দটি শেষ পর্যন্ত কেবল নামটুকুই যোগ করে, ফল পাল্টায় না।

এ তর্ককে শক্ত করতে কয়েকটি রূপক ও চিন্তা পরীক্ষা টেনে আনি। প্রথম রূপক দুটি দরজা। দরজা ক শূন্যতা, দরজা খ অশর্তাধীন ধাতু। দু দরজা পেরিয়ে যে মাঠে পৌঁছানো যায় সেখানে জন্ম ঘটে না, জরা নেই, মৃত্যু নেই; অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই। এখন জিজ্ঞেস করুন, মাঠে দাঁড়িয়ে আপনি কি বলতে পারবেন কোন দরজা দিয়ে ঢুকেছিলেন। যদি না পারেন, তবে দু দরজার নামফলক ভিন্ন হলেও গন্তব্য এক। দ্বিতীয় রূপক দুটি প্রদীপ। এক প্রদীপ নিভে গেছে বাতাসে, অন্যটি ঢাকনা দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রদীপের আলো, অর্থাৎ অভিজ্ঞতার প্রবাহ, দুটিতেই শেষ। বাতাসে নিভেছে বনাম ঢাকনা দিয়ে নিভেছে এ পার্থক্য ঘটনাপূর্ব কারণবর্ণনায়; কিন্তু নিভে যাওয়া এই ফলের জায়গায় তুল্য। নির্বাণের ক্ষেত্রে অশর্তাধীন নামের ঢাকনা, চার্বাকের ক্ষেত্রে প্রকৃতিস্থিতির বাতাস; আলো দুটিতেই নিভে যায়। তৃতীয় রূপক নদী ও জলাশয়। নদীর স্রোত থেমে জলাশয়ে ঢুকে গেলে জলের নতুন গতির কথা বলা যায় না; নদী পরিচয়ের দিক থেকে সেটি সমাপ্ত। নির্বাণে স্রোত থামে বলেই তো বলা হচ্ছে জন্ম নেই; সুতরাং থামা র এই বর্ণনা নিজেই এক সমাপ্তি ঘোষণা, যা চার্বাকের শেষ এর সঙ্গে ফলগতভাবে সমার্থক।

এখন গণ্যতত্ত্বের একটি প্রশ্ন তোলা যাক, স্থিতির মানদণ্ড। যদি কোনো অবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচয়, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, অনুভব, এই সব কিছুর ধারাবাহিকতা একেবারে অনুপস্থিত হয়, তবে কার্যকর অর্থে আমি বলে যে সত্তা, তার অস্তিত্ব দাবির মানে থাকে কী। নির্বাণ পরবর্তী অবস্থাকে যদি বলা হয় চিরশান্ত, অবর্ণনীয়, অজাত, এসব শব্দের নান্দনিকতা সত্ত্বেও সেই অবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনও ধারাবাহিকতা না থাকলে সেটিকে অভিজ্ঞতার টেবিলে রাখার উপায় নেই। ঠিক এই জায়গায় চার্বাকের ভাষা বেশি সৎ, সে কোনো তৃতীয় অর্থের অবস্থান দাঁড় করায় না, বলে, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শূন্য, সেখানেই দাবিও শূন্য। বৌদ্ধ বয়ান এখানে কাব্যময়তাকে আশ্রয় করে, কিন্তু কাব্য যুক্তির জায়গায় প্রমাণ নয়। এ কথা স্বীকার করলেই তর্কপরীক্ষার মেকানিজমে চার্বাকের স্বচ্ছতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

বৌদ্ধ আপত্তিকারী সাধারণত বলেন, নির্বাণ বিনাশ নয়, নিরোধ, এটি দুঃখের কারণের নিবৃত্তি, অস্তিত্বহীনতা নয়। কিন্তু নিরোধের ফল যদি হয় যে কোন জন্ম আর ঘটছে না, কোন জরা নেই, কোন মৃত্যু নেই, তাহলে অভিজ্ঞতার দিক থেকে তা বিনাশবাদের চূড়ান্ত অবস্থারই সমার্থক। নিরোধ নামটি শ্রুতি মধুর, কিন্তু নিরোধ এর কার্যকর ফল যদি অভিজ্ঞতা শূন্য হয়, তবে বিনাশ এর সাথে কী করে তা ভিন্ন। নামপল্টানো মাত্র। আরেকটি আপত্তি, নির্বাণ অস্তিত্ব অনস্তিত্বের বাইরের একটি বাস্তবতা। এখানে বাইরে শব্দটি অজ্ঞেয়বাদী ছায়া টেনে আনে; পরীক্ষা অযোগ্য যে দাবিকে আপনি বাইরে বলে রক্ষা করবেন, তা দর্শনের আদালতে টিকতে চাইলে অন্তত একটিমাত্র পরীক্ষণ মানদণ্ড দেখাতে হবে। না হলে এটি ভাষার মায়া। পরীক্ষা অযোগ্য দাবির সঙ্গে সমতুল্য ফল বিবরণ ধরে চার্বাককে খণ্ডন করা যায় না, বরং চার্বাকের কম অনুমানের তত্ত্বই তখন অর্থগত অর্থনীতার নিয়মে প্রাধান্য পায়।

এখানে ওকামের ক্ষুরের কথা স্মরণযোগ্য। দুটি তত্ত্ব যদি একই ফল দেয়, তবে কম অনুমান জড়িত তত্ত্বটিই যুক্তিসঙ্গত। চার্বাকের অনুমান অল্প। দেহ নিভলেই আলো নিভে যায়, ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার শেষ। নির্বাণ বর্ণনায় একটি অতিরিক্ত সংযোজন আছে, অশর্তাধীন নামের এক ধাতু, যা না অস্তিত্ব না অনস্তিত্ব, তবু ফলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অবসানই ঘটায়। এই অতিরিক্ত সংযোজন ফল পাল্টায় না, কাজেই দার্শনিক অর্থনীতিতে এটি অতিরিক্ত ব্যাগেজ। বুদ্ধের ভাষায় এটি কাব্যিক মহিমা, তবে তর্কে এটি উপপাদ্য নয়। বৌদ্ধ পক্ষে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ, এ অশর্তাধীনকে শুধু নাম নয়, ফলগত পার্থক্য হিসেবে দেখানো। যতক্ষণ সেটা না হয়, ততক্ষণ চার্বাকীয় ফল সমতা টিকে থাকবে।

আরও একটি চিন্তা পরীক্ষা। একটি মঞ্চনাটক কল্পনা করুন। চরিত্র ক মৃত্যুবেলায় পর্দার আড়ালে হারিয়ে যায়; চরিত্র খ নির্বাণে পৌঁছে আলোর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যায়। দর্শকগণ কেবল পর্দার পরের নীরবতা দেখেন। কেউ ফিরে আসে না, কেউ কথা বলে না, কোনো নতুন দৃশ্য শুরু হয় না। দর্শকের অভিজ্ঞতায় দুই প্রস্থান অভিন্ন। নাট্য সমালোচক এরপর লিখলেন, ক এর প্রস্থান শেষ, খ এর প্রস্থান অজাত এ প্রবেশ। এই দুই ভাষা নাট্য বাস্তবতায় আলাদা ফল দেখাতে পারল কি। না। সুতরাং ভাষার অলঙ্কার ও অভিজ্ঞতার ফল, এই দুইকে আলাদা করে দেখা মাত্রেই বোঝা যায়, নির্বাণ ও চার্বাক শেষ দৃশ্যে এসে একই মঞ্চ ভাগ করে নেয়।

এ পর্যায়ে কেউ বলতে পারেন, নির্বাণ নৈতিক সাধনার ফল; চার্বাক নৈতিকতার প্রতি উদাসীন। কিন্তু আমরা নীতিশাস্ত্রের আলাপ তুলছি না; আমরা শুধু শেষ অবস্থার তুলনা করছি। নৈতিক অনুপ্রেরণা সত্য মিথ্যার প্রমাণ নয়; অনেক মিথ্যাও নৈতিক অনুপ্রেরণা জোগায়, অনেক সত্যও কঠিন ও নিরাবেগ। কাজেই নৈতিকতা দিয়ে চার্বাককে খণ্ডন বা নির্বাণকে প্রমাণ করা যাবে না। সত্যের আদালতে দাঁড়াবে কেবল ফল বর্ণনা। আর সেই ফল বর্ণনায় দুই পক্ষ সমার্থক, একদিকে সব শেষ, অন্যদিকে সব নিবে গেছে।

এখানে ভাষাতত্ত্বের একটি কৌশলগত প্রশ্নও আছে। যদি একটি শব্দ নির্বাণ নিজের সংজ্ঞায়ই বলে আমি বর্ণনার বাইরে, তবে সেই শব্দের প্রস্থাপিত দাবিটি জন্ম জরা মৃত্যু নেই কীভাবে ভাষিক সত্য শর্ত অর্জন করে। যদি বলেন কারণ সিদ্ধপুরুষেরা জানেন, তবে সেটি কর্তৃত্ব দাবি, প্রমাণ নয়। যদি বলেন ধ্যান অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে, তবে সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা তো আবার ভাষায়ই। আর যদি অভিজ্ঞতা নির্বচন অসম্ভব, তবে দাবি টাই নিরুদ্দেশ। ঠিক এই টানাপোড়েনে বৌদ্ধ নির্বাণ বর্ণনার দার্শনিক দুর্বলতা চোখে পড়ে। শব্দের শৌর্য বেশি, প্রমাণের দিক পাতলা। চার্বাক ঠিক বিপরীত, শব্দ কম, প্রমাণের প্রতিশ্রুতি বেশি।

এ পর্যায়ে একটি সম্ভাব্য পাল্টা প্রশ্ন। ধরা যাক ফল সমতা আছে, তবু নির্বাণকে মূল্যবান বলা যায়, কারণ এতে ভয় আসক্তি নিভে যায়। এর জবাব সহজ। আমরা মূল্য আলোচনা করছি না; আমরা কেবল বলছি, ফল সমতার জায়গায় এসে চার্বাক ও নির্বাণ এক। আপনি নির্বাণকে মূল্যবান বলতে পারেন, কিন্তু সেটি চার্বাকের শেষ এর থেকে ফলগতভাবে ভিন্ন এই দাবি তুলতে পারবেন না। ভিন্নতা দেখাতে হলে পরীক্ষণ যোগ্য একটিমাত্র বৈশিষ্ট্য দেখাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাণ পরবর্তী কোনো চিহ্ন যা চার্বাকের শেষ এ অনুপস্থিত। এমন চিহ্ন যদি নীতিগতভাবেই অস্বীকার করা হয়, নির্বাণ অবচিহ্ন, অচিহ্ন, তবে ফল সমতার দাবি শক্তি পায়।

সমালোচনার ধার আরেকটু বাড়াই। বুদ্ধ নিজে উচ্ছেদবাদীদের সমালোচনা করেছেন, মৃত্যুতে সব শেষ ধারণাকে তিনি ভুল বলেছেন। কিন্তু তাঁর দেয়া শেষ অবস্থার ছবি, জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, এই ছবি যদি অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে চার্বাকের ছবির সাথে অভিন্ন হয়, তবে উচ্ছেদ সমালোচনা কাকে উদ্দেশ করে। এতে কি এমনটা দাঁড়ায় না যে বুদ্ধ একই ফলকে ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে আলাদা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। চার্বাকের বিরুদ্ধে যথাযথ তর্ক হতো, যদি নির্বাণ অবস্থায় কিছু এমন দেখানো যেত যা চার্বাকের শেষ এ নেই। কিন্তু আমরা দেখি, কোনো অভিজ্ঞতাক্রম নেই, কোনো জন্ম নেই, কোনো মৃত্যু নেই। চার্বাকের শেষ এও নেই। দার্শনিক প্রভেদ কোথায়।

শেষে, একটি সারসংক্ষেপ যুক্তি। ক নির্বাণ পরবর্তী অবস্থায় জন্ম জরা মৃত্যু নেই। খ জন্ম জরা মৃত্যু না থাকলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই। গ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা না থাকলে অস্তিত্ব শব্দটি কার্যকরভাবে প্রযোজ্য নয়। ঘ কাজেই নির্বাণ পরবর্তী অবস্থার ফলগত অর্থ দাঁড়ায় অভিজ্ঞতা শূন্য, যা চার্বাকের সব শেষ এর সমার্থক। তর্কের ভাষায়, দু দর্শনের শেষ অবস্থা extensionally equivalent, বাহ্যিক প্রয়োগক্ষেত্রে এক। অন্তঃসারভেদ দেখাতে না পারলে নামভেদ দার্শনিক প্রমাণ নয়।

এই দীর্ঘ আলোচনার সারমর্ম তাই উত্তেজক হলেও সরল। চার্বাক ও নির্বাণ, দুটি পথ, দুই শব্দভাণ্ডার, দুটি ঐতিহাসিক পরিসর। কিন্তু চূড়ান্ত দৃশ্যে এসে পরিণতি একই। কেউ একে বলবেন শেষ, কেউ বলবেন নিরোধ, কেউ বলবেন অজাত অমৃত। দর্শনের চোখে তিনটিই অভিন্ন ফল ঘোষণা। 

অতএব শেষ প্রশ্নটি পাঠকের দিকে ছুঁড়ে দিতে চাই-

 গৌতম বুদ্ধ যে নির্বাণ পরবর্তী অবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই, কোনো অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নেই, সেটি কি মূলত চার্বাকদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই নতুন অলংকারে পুনঃউপস্থাপন নয়?

QBSUJON

ঈশ্বর নেই বলিনি, খুঁজে পাইনি বলেছি...

qbsujon

শুরুটা
একেবারেই সাধারণ ছিল, আমি কেবল জানতে চেয়েছিলাম।

না, কোনো বিদ্রোহের শখ ছিল না, মূর্তি ভাঙার মঞ্চেও উঠিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, কে আছেন? সত্যিই আছেন তো?

বলা হয়, তিনি আছেন। কিন্তু কোথায়?

আমি চারদিকে তাকালাম। গায়ে সাদা জামা, মনের ভেতর কালো প্রশ্ন, আর চোখে পাথরের মতো এক টুকরো বিস্ময়। রাস্তায় হাঁটছি, কানে বাজছে লাউডস্পিকারে প্রার্থনার শব্দ। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। এই যে সবাই এত আত্মবিশ্বাসে বলে, ঈশ্বর আছে, তারা কি দেখা পেয়েছে?

তারা বলে, বিশ্বাস করো।

আমি বলি, বিশ্বাস কেন করব?

তারা বলে, প্রশ্ন কোরো না। এ পাপ।

আমি বলি, প্রশ্নই যদি পাপ হয়, তবে উত্তরগুলো এত অসহায় কেন?

ধর্মের দোকানে ঢুকলাম। সেখানে পুজোর প্যাকেজ, উপবাসের ছাড়, দান করলে এক্সট্রা কৃপা ফ্রি, সবই আছে। শুধু নেই সেই যিনি দোকানের মালিক!

একজন বললেন, তিনি মাটির মধ্যে। আরেকজন বললেন, তিনি আকাশে। কেউ বললেন, জলেই তিনি, আবার কেউ বললেন, চোখে ধরা যায় না, মন দিয়ে দেখতে হয়।

আমি মন দিয়ে দেখতে চাইলাম।

কিন্তু মন তো বিভ্রান্ত! সে তো বিজ্ঞাপনে বিভোর, রঙিন পোশাকে আচ্ছন্ন। সে তো ঈশ্বর খোঁজে না, খোঁজে স্বস্তি, নিরাপত্তা আর লাভ।

আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, ঈশ্বর কি তাহলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান?

জিজ্ঞাসা করতেই কেউ আমার দিকে আগুন ছুঁড়ল। বলল, তুমি নাস্তিক? আমি বললাম, তুমি যে আস্তিক, তার প্রমাণ কী?

সে বলল, আমার বিশ্বাসই প্রমাণ।

আমি বললাম, তাহলে আমার সন্দেহই যুক্তি।

আমি দেখলাম, মানুষ প্রার্থনার নামে নিজেকে আশ্বস্ত করে। বিপদের সময় তাঁকে ডাকে, আর স্বস্তির সময় ভুলে যায়। ঈশ্বর যেন এমারজেন্সি সার্ভিস, ২৪ ঘণ্টা অন, কিন্তু কল রিসিভ হয় কদাচিৎ।

একবার এক ভক্ত বললেন, আমি মন্দিরে গিয়ে দান করেছি, এবার ব্যবসায় লাভ হবেই। আমি হাসলাম না, কাঁদিনি। শুধু ভাবলাম, যদি ঈশ্বর এতই লোভী হন, তবে শয়তান কেমন?

শুনেছি, ঈশ্বর বিচার করবেন। ভালোমন্দের হিসেব রাখেন।  

কিন্তু এই যে ধর্ষিতা শিশু, এই যে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া গরিব পরিবার, এদের অপরাধ কী ছিল?

আমাকে বলা হলো, এটা পরীক্ষা।

তাহলে প্রশ্ন করছি, কাকে প্রমাণ দিচ্ছে তারা? কোন পরীক্ষায়, কাদের সামনে, কিসের জন্য?

আমাকে বলা হলো, জন্মপূর্ব পাপের শাস্তি।  

আমি বললাম, বিচার যদি হয় অতীতের নামে, তবে ভবিষ্যৎ জন্মে কী লাভ?

আমি আরও বুঝতে পারলাম, ঈশ্বরকে চুপ করানোর জন্য চারপাশে অনেক কথা বানানো হয়েছে। ঈশ্বর যেন এক অনুপস্থিত শিক্ষক, তাঁর নামে চলছে স্কুল, চলছে বেতন, চলছে শাসন। কিন্তু তিনি উপস্থিত হন না, কারণ প্রশ্ন করলে ক্লাস থেকেই বের করে দেয় সবাই।

আমি একদিন একটা দরজায় টোকা দিলাম। ভেতর থেকে বলল, ভক্তি নিয়ে এসো।

আমি বললাম, ভক্তি নেই, প্রশ্ন আছে।

তারা দরজা বন্ধ করে দিলো।

আমি বুঝলাম, ঈশ্বর নয়, ভয়ই এই সমাজের প্রধান ঈশ্বর।

ভয়! হারানোর, তিরস্কারের, মৃত্যুর।  

তাই আমরা ঈশ্বর গড়েছি, যাতে ভয়কে শান্ত রাখা যায়।  

আমরা নিয়ম বানিয়েছি, উৎসব বানিয়েছি, রীতিনীতি বানিয়েছি, যাতে ঈশ্বর খুশি থাকেন।  

কিন্তু আমরা একবারও জিজ্ঞাসা করিনি, সত্যিই কি তিনি আছেন?

অন্য ধর্মের লোক বলল, আমার ঈশ্বরই আসল।

আরেকজন বলল, তোমারটা মিথ্যা, আমারটাই সত্য।  

দুইজনই মারামারি করল। রক্ত পড়ল মাটিতে।  

আর আকাশে বসে যদি সত্যিই কেউ থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই কাঁদলেন।

আমার প্রশ্ন বাড়তে থাকলো।

যদি ঈশ্বর সবজান্তা হন, তাহলে তিনি দোষীদের আগে থেকে থামান না কেন?  

যদি তিনি দয়ালু হন, তাহলে এত কষ্টের কী দরকার ছিল?  

যদি তিনি বিচারক হন, তাহলে ধর্মের নামে খুনের বিচার কে করবে?

একজন বলল, তুমি বেশি ভাবো।

আমি বললাম, তুমি কম ভাবো।

একজন বলল, তুমি ঈশ্বর অবমাননা করছো।

আমি বললাম, তুমি ঈশ্বরকে প্রশ্নবিদ্ধ করছো, এত দুর্বল ধরে নিয়ে।

আমার স্ট্যাটাস এখানে থামে না। আমি কেবল বলতে চেয়েছি-

বিশ্বাস হোক, তবে প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে।

ভক্তি হোক, তবে বুদ্ধির আলোয় আলোকিত।

ঈশ্বর হোক, তবে মানুষের ভেতরে, বাইরের ইমারতে নয়।

আমি জানি না, সত্যিই কেউ আছেন কিনা।  

কিন্তু যদি থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই ভয় চান না, প্রশ্ন চান।  

তিনি নিশ্চয়ই প্রমাণ চান না, ভালোবাসা চান।

আমিও তাই চেয়েছিলাম।

শুধু জানতে।


#qbsujon ,#QB_SUJON

#আমি_শুধু_জানতে_চেয়েছিলাম

#ধর্মেরশেষঅস্ত্রভয়

#ভক্তিনয়যুক্তি

#FaithVsFear

#QuestionEverything