গৌতম বুদ্ধের কালাম সূত্র আজ এক করুণ বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার, যেখানে এর প্রকৃত নিরপেক্ষ নির্যাসকে খণ্ডিত করে সুবিধাবাদী ব্যাখ্যার সংকীর্ণতায় বলী দেওয়া হচ্ছে। যে মহান দার্শনিক ভিত্তি মানুষকে শিখিয়েছিল সকল প্রকার অন্ধত্ব, ঐতিহ্য, শাস্ত্র এবং এমনকি নিজস্ব গূঢ় যৌক্তিক অনুমানের ঊর্ধ্বে উঠে পরম নিরপেক্ষতায় সত্যকে অনুসন্ধান করতে, সেই সূত্রকেই আজ একপাক্ষিক স্বার্থে ব্যবহার করে তার মূল নির্যাসকে বিনাশ করা হচ্ছে। এই হত্যার প্রধান কারিগর একদিকে যেমন সেই সব আধ্যাত্মিকতাবাদী, যারা বুদ্ধের এই শিক্ষাকে কেবল নিজেদের অলৌকিক বিশ্বাসের রক্ষাকবচ বানাতে চান, অন্যদিকে তেমনি সেই সব আধুনিক চরমপন্থী জড়বাদী, যারা এই সূত্রকে তাদের উচ্ছেদবাদী মতাদর্শের একমাত্র বৈধ দলিল হিসেবে প্রচার করেন। বুদ্ধ যখন কেশপুত্তীয় কালামদের দশটি বর্জনীয় মানদণ্ড শিখিয়েছিলেন, তখন তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বিচারবুদ্ধিকে চিরতরে মুক্ত করা, কোনো নির্দিষ্ট ‘ইজম’ বা মতবাদের খাঁচায় বন্দি করা নয়। বুদ্ধ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দশটি প্রমাণের ভিত্তি, যেমন লোকশ্রুতি, পরম্পরা, ধর্মগ্রন্থ বা কেবল তর্কের খাতিরে কোনো কিছু গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানের বিশ্লেষকরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই সূত্রের ‘চতুবিধ আশ্বাস’ থেকে কেবল সেই অংশটুকুই জনসমক্ষে আনেন যা তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের অনুকূলে যায়। জড়বাদীরা যখন এই সূত্র টেনে দাবি করেন যে মৃত্যুর পর নিশ্চয়ই কিছু নেই এবং বুদ্ধ পরকালকে উড়িয়ে দিয়েছেন, তখন তারা বুদ্ধের সেই প্রাথমিক নির্দেশটিই সরাসরি লঙ্ঘন করেন, যেখানে তিনি কেবল অনুমানের বশবর্তী হয়ে বা নিজস্ব মতবাদের সাথে মিল আছে বলেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ, মৃত্যুর পর চেতনার সম্পূর্ণ বিনাশ হওয়াও একটি অপ্রমাণিত অনুমান এবং এক প্রকার অন্ধ একদেশদর্শিতা মাত্র। বুদ্ধের নিরপেক্ষতা ছিল এক বিশাল আকাশপ্রতীম অবস্থান, যেখানে তিনি পরকাল থাকা বা না থাকার নিষ্ফল তর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না করে, তাদের বর্তমান মুহূর্তের নৈতিক বিশুদ্ধতা ও মৈত্রীর দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এখানে উভয় পক্ষকেই কঠোরভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন যে, কালাম সূত্র কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের বিজয় ঘোষণা করার জন্য রচিত হয়নি। আধ্যাত্মিকতাবাদীরা যদি মনে করেন এই সূত্র তাদের অন্ধ ভক্তিকে প্রশ্রয় দেয়, তবে তারা ভুল করছেন, কারণ বুদ্ধ এখানে শাস্ত্রীয় দোহাইকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার জড়বাদীরা যদি মনে করেন এই সূত্র তাদের ‘জড়তা’ বা ‘উচ্ছেদবাদ’-এর সার্টিফিকেট, তবে তারাও বুদ্ধের সেই ‘যদি’ (Ce) শব্দটির গভীরতাকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। বুদ্ধ সেখানে একটি নিরপেক্ষ গাণিতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন মাত্র, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। বুদ্ধের সেই মহান মধ্যপন্থাকে যখন কেউ জোরপূর্বক একপাক্ষিক ‘জড়বাদ’ কিংবা ‘আস্তিক্যবাদ’ বলে দাবি করে, তখন আসলে কালাম সূত্রের সেই স্বাধীন অনুসন্ধানের চেতনাকেই হত্যা করা হয়। বুদ্ধ মৃত্যুকে একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রেখেই মানুষকে বর্তমানের কর্মে মনোযোগী হতে বলেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে ‘মৃত্যুর পর সব শেষ’, এই উচ্ছেদবাদী ধারণাটি যেমন মানুষকে দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলতে পারে, তেমনি ‘সবই আগে থেকে নির্ধারিত’ যা পূর্ব কর্মের ফলে হয়েছে, এই শাশ্বতবাদী ধারণাও মানুষকে বিচারহীন অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। কালাম সূত্রের এই অপব্যাখ্যা আসলে একটি দার্শনিক অপরাধ, কারণ এটি বুদ্ধের ‘বিচয়’ বা ইনভেস্টিগেশন ধর্মী শিক্ষাকে একটি মৃত ও একঘেয়ে তত্ত্বে পরিণত করে। বুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একটি আয়নার মতো যেখানে কেবল সত্যেরই প্রতিফলন ঘটে, অনুসন্ধান ঘটে, সেখানে কোনো ব্যক্তিগত পূর্বানুমানের স্থান নেই। জড়বাদীরা যখন কালাম সূত্র টেনে পরকালকে উড়িয়ে দেওয়ার আস্ফালন দেখান, তারা আসলে বুদ্ধের সেই সতর্কবাণীই ভুলে যান, যে কোনো কিছুকেই অকাট্য প্রমাণ ছাড়া এবং নিজের অভিজ্ঞতায় আসা সরাসরি জ্ঞান ছাড়া চিরন্তন সত্য বলে দাবি করা এক প্রকার মোহ।
কালাম সূত্র কোনো জড়বাদী ইশতেহার নয়, আবার এটি কোনো অলৌকিক বিশ্বাসের দলিলও নয়। এটি হলো মানুষের চেতনার চূড়ান্ত স্বাধীন অনুসন্ধানের এক মহাপত্র, যা আজ স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যার ভিড়ে তার গাম্ভীর্য হারাচ্ছে। বুদ্ধের ‘চতুবিধ আশ্বাস’এর মূলে নিহিত ছিল পরকাল থাকুক বা না থাকুক, নৈতিক জীবন যাপন করাই হলো সবথেকে নিরাপদ ও বুদ্ধিদীপ্ত পথ। যখন কোনো পক্ষ কেবল নিজেদের সুবিধামতো অংশটুকু তুলে ধরে উল্লাস প্রকাশ করে, তখন তারা বুদ্ধের সেই সামগ্রিক সত্যকে অস্বীকার করে। এই ভারসাম্যটি নষ্ট করাই হলো কালাম সূত্রের প্রকৃত হত্যা। বুদ্ধ কোনো পক্ষ নেওয়ার জন্য বা কোনো একপক্ষকে জয়ী করার জন্য এই সূত্র প্রচার করেননি, বরং তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন সব ধরনের ‘ইজম’ থেকে মুক্ত হয়ে নিজের প্রজ্ঞা জাগ্রত করে। যখনই এই সূত্রকে কোনো একপাক্ষিক মতাদর্শের হাতিয়ার বানানো হয়, তখনই এর মধ্যপন্থা বা নিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বুদ্ধের শিক্ষা কোনো ধ্বংসাত্মক উচ্ছেদবাদ ছিল না, আবার তা কোনো যুক্তিহীন আধ্যাত্মিকতাও ছিল না, তা ছিল অসীম প্রজ্ঞার এক জ্যোতি যা কোনো নির্দিষ্ট দলের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এখানে সেই সব পক্ষকে হুঁশিয়ার করা প্রয়োজন, যারা বুদ্ধের নাম ব্যবহার করে নিজেদের চিন্তাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। সত্য উন্মুক্ত, এবং সেই উন্মুক্ত সত্যকে জানার জন্য প্রয়োজন পক্ষপাতহীন এক মন, যা কালাম সূত্রের প্রকৃত দাবি। এর বাইরে গিয়ে কেবল নিজের সুবিধামতো বুদ্ধকে ব্যাখ্যা করা মানেই হলো সেই মহান আলোকবর্তিকাকে নিভিয়ে ফেলা এবং কালাম সূত্রের পবিত্র নির্যাসকে হত্যা করা। বুদ্ধের নিরপেক্ষতা মানে কোনো পক্ষে না থাকা নয়, বরং সকল পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সত্য অনুসন্ধানের মুখোমুখি হওয়া।
0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন